গল্প : বিশ্বরোড টু নীলক্ষেত

0
51

সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিমে। কুড়িলের ওপাশে বিশ্বরোড লাগোয়া লেকের পানিতে ম্রিয়মান রোদের খেলা। বাতাসে শীত। কান-মাথা ঢেকে বেরিয়েছে আনু…নীলক্ষেতে যেতে হবে কিছু বই কিনতে। নীলক্ষেতের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শত শত বইয়ের দোকানের দৃশ্য। কত রকমের ক্রেতা সেখানে আসে তা বোঝা মুশকিল। ইডেনের চল্লিশ হাজার মেয়ের যাতায়াত তো ওখানেই…তাছাড়া রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণীরা। গাদাগাদিতেও চারপাশ বড় মনোরম মনে হয়!!
আনুর মনে পড়ে যায় সেই ক্যাম্পাস লাইফের কথা। প্রতি ইয়ারে বই কিনতে হত…বছর জুড়ে বই না কিনলেও বড় দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় নীলক্ষেতে। তবে অ্যাকাডেমিকের বাইরের বই আর পুরনো কালেকশন মেলে না। আগে ব্যাপক কালেকশন ছিল। একটা বইয়ের কথা মনে পড়ে আনুর। বইটির নাম কামসূত্র। প্রত্যেক ফুটপাতে বইটি পাওয়া যেত। কিন্তু কেনা হয়নি আনুর। উড়াল সেতু পার হয়েই একবারে লেকের পাশে এসে পড়ে আনু। লেকের পাড়ে একটা বটগাছ। এখনো ছোট। তবে ডালপালা-পাতায় এখনি অন্ধকার..বটগাছটা বড় হলে ভয়ঙ্কর হবে ভাবে আনু। পাশেই লেকে ছলাত ছলাত শব্দ…কেউ গোছল করতে ব্যস্ত। দু’তিনটা টোকাই পানিতে নেমে গেছে শীতের মধ্যেই..ঝটপট তারা গোছল সেরে উঠে পড়ে। আনু পা পাড়ায়..শীতের বেশিক্ষণ থাকে না।
কুড়িল এলাকায় টোকাইয়ের অভাব নেই…পুরো ঢাকা শহরেও একই..আমাদের অর্থনীতি কবে শক্ত হবে..আর কবে গরীব খেটে খাওয়া, নি:স্ব, দুস্থদের পেটে দু’বেলা ভাত যাবে। অার কবেই বা অনাবিল শান্তিতে ভরে যাবে দেশ…এসব কি বাস্তবে হবে না? না চিন্তার মধ্যেই সীমাবন্ধ থাকবে। আনুর মস্তিষ্ক কিলবিল করে। কত চিন্তা মাথায় তার…শাসকরা যদি সেবক হতো তাহলে শহরে কি কোনো টোকাই থাকত? কিন্তু শাসকরা প্রভু সেজে বসে আছে এদেশে।
রাস্তার ওপারেই রেল লাইন। হরদম রেল লাইন পার হচ্ছে লোকজন..কোনো প্রটেকশন নেই। এইতো সেদিনও রেলে কাটা পড়ে মারা গেল রেলে এক কর্মচারী। বেচারা এক নারীর জীবন রক্ষা করতে গিয়ে নিজেই ট্রেনে কাটা পড়ে। খটকা লাগে আনুর। তার এভাবে জীবন দেয়ার তো কোনো দরকার নেই। রেলক্রসিং যদি সুরক্ষিত থাকে তাহলে আর এভাবে তো জীবন দেয়া লাগে না। কষ্ট লাগে আনুর। রেললাইন পার হওয়ার সময় ডান -বামে তাকায় আনু..ওইতো বিশ্ব রোড।
ভাই পা-টা সরান, আনু পা সরিয়ে নেয়। বাসে প্রচণ্ড ভিড়..গন্তব্য নীলক্ষেত…বইয়ের সমুদ্র যেখানে। শীতের মধ্যে গরম লাগতে শুরু করেছে। কুর্মিটোলা হাসপাতাল ডানে..এমইএচ..উড়াল সেতুতে চলে এসেছে বাস। উড়াল সেতুর ওপর থেকে ঢাকা শহর ভিন্ন রকম মনে হয়। মহাকাখালীতে নেমে পড়ে আনু। বাসে ভিড়ে আর থাকতে পারে না। একটা হাটা দরকার…হাটতে তার ভাল লাগে যখন তাড়াহুড়া থাকে না। সামনে রাস্তায় ঠাসা জ্যাম। গাড়িগুলো যেন জমে গেছে……..আর হাটা যাচ্ছে না। আনু গাড়ির খোজে এদিক সেদিক তাকায়। না গাড়িতো চলেই না…উঠে লাভ কি? হাটা ধরে আনু…সামনে মোড় থেকে লেগুনায় আড়ং পর্যন্ত যাওয়ার টার্গেট তার…এরপর সোজা নীলক্ষেতের গাড়ি….লেগুনায় জায়গা নেই..বাধ্য হয়ে পেছনের পাদানিতে ঝুলতে হল তাকে। তাও একজন নয়, তিনজন ঝুলছে। আনুর হাতে দেহের ভারে চিনচিন করে ওঠে। লেগুনায় একটি শিশু কেদেই চলেছে…মা থামাতে পারে না। সন্দেহ হয় আনুর…আসলে কি শিশুটির মা সে? মনে পড়ে চোরাই শিশুর কথা ..এইতো সেদিন হাসপাতাল থেকে শিশু চুরি হল, ঢাকার শিশু ধরা পড়ল নরসিংদী। শিশুকে কাছে পেয়ে মায়ের খুশি আর ধরে না..পত্রিকার পাতায় ছবিটি বেশ আবেগ সৃষ্টিকারী। আর কতক্ষণ দাড়িয়ে থাকা যায়? রাস্তা নয় যেন গাড়ির গ্যারেজ..সব ধরণের গাড়ি গ্যারেজে রেখে দেয়া হয়েছে!!হায়রে ঢাকা শহর, শীতেও কপালে ঘাম জমেছে আনুর…..।
এবারও ভিড় কিন্তু মনটা ভরে গেছে আনন্দে। আনু যেন বুকভরে নি:শ্বাস নিচ্ছে। সামনে শত শথ বইয়ের দোকান….ছেলেমেয়েরা আসছে, যাচ্ছে, বই কিনছে। ক্যাম্পাসের লাইফটা আবার মনে পড়ে যায় আনুর। নীলক্ষেতে কত বই কিনেছে সে। একদিন শাহজাহান স্যার ক্লাসে বললেন পাঠ্যবই নেই কার কার উঠে দাড়াও। অনেকেই উঠে দাড়াল। একজনকে তখুনি পাঠিয়ে দিলেন নীলক্ষেতে। বইটি কিনে নিয়ে ক্লাসেই যোগ দিল ওই ছাত্র। স্যারের এ মজার পদ্ধতি একবারে খারাপ নয়, অবশ্য যারা বই কিনতে চাই না তাদের জন্য শাস্তি বটে!
প্রচণ্ড শব্দে জেগে ওঠে আনু। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে রাস্তায় সেই গ্যারেজে পড়ে আছে সে। বই কিনে সেই দেড় ঘণ্টা আগে গাড়িতে উঠেছিল সে। দুই প্যাকেট বই দাপনার (উরু) উপর…পা ঠিস মেরে ধরেছে। প্রচণ্ড বিরক্তিতে কপাল কুকড়ে গেছে তার। চোখ চলে যায় জানালার বাইরে…এভিয়েশন হাইস্কুল মাঠে শিশুরা খেলছে…গ্যারেজের মধ্যে বসেও একটু স্বস্তি পেল সে। মনের মধ্যে কিলবিল করছে কখন নামব বিশ্বরোড………।

লেখক : আবদুস সামাদ আজাদ, গণমাধ্যমকর্মী ও গল্পকার