রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি কমছে

0
51

কক্সবাজার শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রাম ঠ্যাংখালী। এ গ্রামেরই স্থানীয় বাসিন্দা আক্কাস আলী (৩৮)। বসে ছিলেন বাজারের চায়ের দোকানে। চেহারায় উদ্বেগ আর চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। জানা গেল, পরিবারের খাবার জোগাড় হবে কোত্থেকে, চার সন্তানের পিতা আক্কাস আলীকে সে চিন্তাই এখন আঁকড়ে ধরেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই কক্সবাজারে বাস করছেন তিনি। প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা এসে কক্সবাজারে ঠাঁই নিয়েছে তার চোখের সামনে দিয়েই।

আক্কাস আলীর পরিবারে উপার্জনকারী বলতে তিনি ও তার ছেলে। দুজনের আয়েই পরিবার চলে। পিতা-পুত্র দুজনই পেশায় দিনমজুর। ছয় মাস আগেও তাদের দৈনিক উপার্জন ছিল ৮০০ টাকার মতো। স্বচ্ছন্দে না হলেও এতেই সংসার চলে যেত। তাদের জন্য দিনে এখন এটুকু উপার্জনও হয়ে দাঁড়িয়েছে লটারির টিকিট জেতার মতো। জমানো টাকাও শেষ। বাবা-ছেলে দুজনে মিলে সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ৩০০ টাকা উপার্জন করলেও নিজেদের অনেক ভাগ্যবান মনে হয় তাদের।

রোহিঙ্গা সংকটের পর থেকেই পরিবারের আয়-উপার্জনের এ বেহাল দশা দেখা দিয়েছে। গত বছরের আগস্টে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে রাখাইন প্রদেশ থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু বাংলাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করার পর থেকেই বিপর্যয় নেমে এসেছে আক্কাস আলীদের জীবনে।

আক্কাস আলী বলেন, ‘সাংবাদিক ও বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা আসে শুধু রোহিঙ্গাদের খোঁজ নিতে। কিন্তু এ সংকট আমাদের জীবনেও যে কত দুর্দশা আর দুর্ভোগ এনেছে, তার খবর কেউ রাখে না। রোহিঙ্গারা ত্রাণও পায়, সহানুভূতিও পায়। কিন্তু আমাদের ভাগ্যে কিছুই জোটে না। যদিও আমরা তাদের মতোই দুর্ভোগে পড়েছি।’

নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর রোহিঙ্গা জঙ্গিদের এক সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় রাখাইনে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। ওই অভিযানের বর্বরতা আর নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ৬ লাখ ৭১ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা। আগে থেকেই বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিতভাবে বাস করছিল তিন লাখ রোহিঙ্গা। তারা সবাই বৌদ্ধ সংখ্যাগুরু মিয়ানমারের জাতিগত সহিংসতার মুখে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে পালিয়ে এসেছে। ‘অবৈধ অভিবাসী’ আখ্যা দিয়ে তাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক মানবাধিকারের স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে এসেছে মিয়ানমার।

আগস্টে খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ নানা বর্বরতার মুখে পালিয়ে আসার সময় সহানুভূতির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের স্বাগত জানিয়েছিল অনেক বাংলাদেশী। এ সময় রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার জন্য যতটুকু সম্ভব, তা নিয়েই এগিয়ে আসে বাংলাদেশীরা। ১৬ কোটি মানুষের জনাকীর্ণ দরিদ্র দেশ হওয়া সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের জন্য এটুকু করেছিল বাংলাদেশীরা।

এ রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে এক প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা সই হলেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া এখনো শুরুই হয়নি। অন্যদিকে কক্সবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দামও এখন বাড়তির দিকে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে উজাড় হয়েছে বনভূমি। কমেছে কক্সবাজারের কর্মসংস্থান ও আয়। দিন যত যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের উপস্থিতি এখন স্থানীয়দের জন্য তত বেশি বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আক্কাস আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা এখন ত্রাণ পাচ্ছে। সঙ্গে ১০০-১৫০ টাকায় কাজও পাচ্ছে। আমরা তাদের সহানুভূতি দেখিয়েছি। কিন্তু এখন আমরা নিজেরাই অনেক বেশি সমস্যায়। এখন আমাদেরও ত্রাণের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়।

কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের আশপাশে এখন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উদ্বাস্তু শিবির রয়েছে এক ডজনের মতো। এসব শিবিরের অধিকাংশই উখিয়া থেকে লেদা পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। বর্তমানে এ এলাকার কৃষিজমি ও বনভূমির মধ্যে গজিয়ে উঠেছে প্রচুর কুঁড়েঘর এবং ইট ও টিনের ছাদওয়ালা বাড়ি। শুধু উদ্বাস্তু নয়, পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা, সাহায্য সংস্থা ও ব্যবসায়ীদেরও জায়গা করে দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে সরকার। স্থানীয় এক প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘বনভূমি উজাড় হয়ে গেছে। বুনো জীবজন্তুও উধাও। ইটের স্থাপনায় ঢেকে গেছে কৃষিজমি। খুব কম লোকই এ পরিবর্তন থেকে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু ভুগতে হচ্ছে সিংহভাগ স্থানীয়কে। রোহিঙ্গাদের জন্য আসা মানবিক সহায়তাগুলো এখন কক্সবাজারের স্থানীয়দের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে।’

পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গফর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট ধীরে ধীরে স্থানীয়দের জীবনযাত্রাকেও তছনছ করে দিচ্ছে। আগে কক্সবাজার থেকে অন্যান্য স্থানে প্রচুর পরিমাণে পান ও তরমুজ বিক্রি হতো। কিন্তু এখানে এখন চাহিদা ও দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা অন্য স্থান থেকে এসব পণ্য সংগ্রহ করছেন। কৃষিজমিও কমে এসেছে। ফলে আমাদের এখানে শস্য ও সবজি সরবরাহও এখন অনেক কম। পশুচারণের ভূমিও এখন অনেক কমে গেছে। স্থানীয় শ্রমবাজারকে পুরো ধসিয়ে দিয়েছে উদ্বাস্তুরা এবং স্থানীয়রা তাদের জীবিকার উপায় হারিয়ে ফেলেছে। তারা মিয়ানমারে ফিরে যাক বা না যাক, কক্সবাজার কখনই আর আগের মতো হবে না।’

মিয়ানমার থেকে ব্যাপক হারে উদ্বাস্তু আসা শুরুর পর পরই তাদের আশ্রয় শিবির নির্মাণের জন্য এখানকার ১ হাজার ২১৪ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ সরকার। এসব জমির অধিকাংশই ছিল বনভূমির অন্তর্ভুক্ত। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়, কক্সবাজারের বনভূমি, জমি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যে ২৮ ধরনের হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গা শিবিরগুলো।

সে সময় প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে বনভূমি ও পাহাড় ধ্বংস হওয়ার কারণে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হবে বন্যপ্রাণী; বিশেষ করে জেলার অন্তর্ভুক্ত দুটি ন্যাশনাল পার্ক যখন বুনোহাতি ও কয়েকটি বিরল প্রজাতির পাখির একমাত্র আবাসস্থল হিসেবে চিহ্নিত।

এতে আরো বলা হয়, যদি সরকার আরো শিবির স্থাপন করতে থাকে, সেক্ষেত্রে বেশ কয়েক প্রজাতির প্রাণী ও বৃক্ষ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী জানান, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর উদ্বাস্তু সংকটের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘জনগণ দেখতে পাচ্ছে, তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, আয় কমছে, বনভূমি উজাড় হচ্ছে, কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে— সব মিলিয়ে গোটা কক্সবাজারের সার্বিক পরিবেশই এখন হুমকির মুখে। প্রতিদিনই তাদের যে ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা তাদের এ উদ্বেগের ভিত্তি হিসেবে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এসব উদ্বাস্তু যে কোনো দিন ফিরে যাবে, সে বিশ্বাসটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন স্থানীয়রা। এখনকার মানুষ উদ্বাস্তুদের ঘৃণা করে না ঠিকই, কিন্তু আর্থসামাজিক সংকট তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। বিষয়টি যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

ক্যাথলিক দাতব্য সংস্থা কারিতাসের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান উইলিয়াম পিন্টু গোমেজ জানান, তাদের সংস্থা সম্প্রতি এক জরিপ চালিয়ে দেখেছে, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে স্থানীয়দের মনোভাব এখন পুরোপুরি নেতিবাচক। তিনি বলেন, ‘এ সংকটের কারণে জনগণ যেসব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিবেশগত চাপের মুখে পড়ছে, সেগুলোই তাদের হতাশ করে তুলছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয়দের পরিস্থিতি এখন উদ্বাস্তুদের চেয়েও খারাপ। তাদের আয় কমেছে, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে তারা পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়েও নিতে পারছে না।’

তিনি আরো বলেন, উদ্বাস্তুদের মতো স্থানীয়দেরও এখন সরকার ও সাহায্য সংস্থার কাছ থেকে সহযোগিতা পাওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করাটা মানবিক কর্মকাণ্ডের একটি মৌলিক বিষয়। দাতারা এখনো স্থানীয়দের সহায়তা দিতে প্রস্তুত নয়। কিন্তু গুরুতর ইস্যুটিকে যে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই, এটাও তাদের বোঝা উচিত।