বিলেতে বাঙ্গালী শিল্পীদের ঈদ

0
201

আমারদেশলাইভ ডেস্ক

মুরুব্বিরা আকাশে শাওয়ালের চাঁদ  দেখে ঈদ উল ফিতর পালন করলেও এ প্রজন্মের মানুষ ইন্টারনেট ও ফেইসবুকে খবর পেয়ে যায় চাঁদ উঠেছে কিনা। বিলেতেও এ প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা ইন্টারনেটে শাওয়ালের চাঁদ উঠার খবর পাওয়ার সাথে সাথে পরিকল্পনা করে ঈদ উদযাপনের। আর বিলেতের বাঙ্গালী সংস্কৃতি কর্মীরাও ঈদের দিন কাটিয়েছে নানা আয়োজনে। ঈদ আড্ডায় বাঙ্গালী শিল্পীদের সাথে কথা হয় বিলেতে তাদের ঈদ উদযাপনের অনুভূতি,ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটা ও নানা মুখরোচক রান্নার আয়োজন নিয়ে। এছাড়া শিল্পীরা জানিয়েছেন ঈদ উপলক্ষে তাদের কি কি পরিবেশনা কোন কোন মিডিয়ায় পরিবেশিত  হয়েছে। বিলেতের অভিনয়, নাচ, গান ও আবৃত্তির বাঙ্গালী শিল্পীদের ঈদ উদযাপনের খবর জানাচ্ছেন মাহবুব আলী খানশূর ছবি তুলেছে টাইমফ্রেম ইভেন্টস।

বিলেতের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব  শরীফ মোহাম্মদ তার ঈদ উল ফিতরের উদযাপনের অনুভূতি প্রসঙ্গে বলেন , আলহামদুলিল্লাহ এবারের ঈদ বেশ ভাল কেটেছে , পরিবার ও স্বজনদের সাথে। প্রায় দুই মাস আগ থেকে ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয়। ঈদ উপলক্ষে বাসার জন্য বিভিন্ন পন্যের লিস্ট করা এবং  সন্তানদের জন্য বাংলাদেশী পোষাক অর্ডার দেয়া। এছাড়া ঈদের পর কোথায় কোথায় বেড়াতে যাবো তারও পরিকল্পনা হয় সেসময়। আমার ও আমার স্ত্রীর দেশীয় খাবার পছন্দ কিন্তু বিলেতে বেড়ে উঠা আমাদের সন্তানেরা কম তৈলাক্ত হালকা খাবার পছন্দ করে। তাই ঈদে সবার পছন্দানুযায়ী খাবার রান্না করা হয়। তবে দেশীয় মিষ্টান্ন আমরা সবাই পছন্দ করি।ঈদ উপলক্ষে আমরা পরিবারের সবাই লন্ডন থেকে কার্ডিফে যাই বেড়াতে। এবারের ঈদের জামাত পড়েছি জনপ্রিয় ইসলামী ব্যক্তিত্ব মুফতি মেনক এর ইমামতিতে পূর্ব লন্ডনের ইলফোর্ডের ভেলেন্টাইন পার্কে। বিলেতে ও বাংলাদেশে ঈদ উদযাপনে এখন তেমন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। চাঁদ রাত থেকেই বিলেতে মুসলমানদের মাঝে ঈদের আমেজ তৈরী হয়। ছোট শিশু ও মেয়েরা হাতে মেহেদী লাগায় এবং একে অপরকে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর ঐতিহ্য শুরু হয় তখন থেকেই। শরীফ মোহাম্মদের মতে, বিলেতে বাংলাদেশী সংস্কৃতির  ভবিষ্যত অনেক ভাল হতে পারে। যদি প্রতিটি বাবা মা তাদের সন্তানদের সময় দিয়ে নিজেদের সংস্কৃতিকে সন্তানদের মাঝে সম্পৃক্ত করতে পারেন। ঈদের প্রকৃত আনন্দ ঈদের নামাজ পড়া এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানো।

ঈদ উপলক্ষে রান্না করা উপভোগ করছেন বিলেতের বাংলাদেশী শিল্পীরা

বিলেতের বাঙ্গালী পাড়ার  নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার সাবিরা সুলতানা সোনিয়া। এবারের ঈদ প্রসঙ্গে তিনি জানান , খুব ভাল কেটেছে। অন্য বারের চেয়ে ইকটু আলাদা। আগে ঈদের দিনে বাসায় থাকতাম গেস্টদের আপ্যায়ানের জন্য। কিন্তু এবার আমি ঈদের দিনে বন্ধু ও আতœীয়দের বাসায় গিয়েছি। আর ঈদের পরের দু’দিন বন্ধু- বান্ধব ও আতœীয়দের আমার বাসায় দাওয়াত দিয়েছি। পুরো তিন দিন ঈদের জম্পেস আড্ডা হয়েছে। অনেক আয়োজনের মধ্যে ছিল পরিবারের সদস্যদের জন্য পোষাক কেনা এবং বন্ধু- বান্ধব ও আতœীয়দের জন্য গিফট কেনা। এছাড়া বাসায় নানা ধরনের খাবার রান্না করেছি এবং নতুন করে সাজিয়েছি বাড়ির প্রতিটি রুম। দেশে আর বিলেতে ঈদ পালনে অনেক পার্থক্য। দেশে বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব, আতœীয়-স্বজনদের সাথে ঈদ পালনে আনন্দই আলাদা। এখানে সেটা মিস করি। বিলেতে ঈদের দিনেও অনেক কাজ করতে হয়,যেটা আমার ভাল লাগে না। আমার মনে হয়, বছরের এই বিশেষ দিনে পরিবারের সবাইকে সময় দেয়া উচিত। এবারের ঈদে চ্যানেল এস‘র একটা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে আমার একটা মিউজিক ভিডিও প্রচারিত হয়েছে। এছাড়া টিভি ওয়ানে ঈদ উপলক্ষে প্রচারিত একটা ছোট নাটিকায় আমি অভিনয় করেছি। বিলেতে বাংলাদেশী সংস্কৃতির ভবিষ্যত উজ্জ্বল বলে আমার মনে হয়। কারন দিন দিন এখানে বাংলাদেশী সংস্কৃতির চর্চা বাড়ছে। সুস্থ চিন্তা ও মননের কিছুটা ঘাটতি থাকলেও আমাদের আগামী প্রজন্মের মধ্যে বাংলাদেশী সংস্কৃতি চর্চা শুরু হয়েছে।

পূর্ব লন্ডনের কোন অনুষ্ঠানে গানের আয়োজন থাকলে নূরজাহান শিল্পীর ডাক পরে না এমনটা খুব কমই হয়।  তিনি জানান , এবারের ঈদ কেটেছে খুব ভাল ও অনেক ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে। এবারের ঈদের জন্য অনেক ধরনের প্রস্তুতি ছিল। কেনা কাটা , রান্না বান্না  আরো কত কি। বিলেতে বাঙ্গালী সংস্কৃতির ভবিষ্যত ভাল বলেই আমার মনে হয়। কারন এখানে অনেকেই শিল্পমনা। আর এখানকার অধিকাংশ বাঙ্গালী গান খুব পছন্দ করে। বিলেতে ঈদ উদযাপন বাংলাদেশের সাথে কোন কোন ক্ষেত্রে মিল আছে আবার কোন ক্ষেত্রে অমিল। এখানে আমরা পরিবারের সদস্য ও আতœীয় স্বজন থেকে অনেক দূরে থাকি। তাই এখানকার প্রতিবেশি ও বন্ধু বন্ধবদের আপন করে নেই সবাই। বিলেতের দর্শক ও পাঠকদের কাছে নূরজাহান শিল্পীর অনুরোধ বেশি করে বাংলা গান শুনুন ও অপরকে শুনতে অনুপ্রানীত করুন। যাতে করে বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিশে^ ছড়িয়ে পড়ে।

বিলেতের বাঙ্গালী পাড়ায় বাস না করলেও যার মন পড়ে থাকে এখানে তিনি আবৃত্তিকার ও  উপস্থাপক  নূর আবসার। ঈদ আড্ডায় তিনি জানান, ঈদ বেশ ভালো কেটেছে আলহামদুলিল্লাহ। ঈদ জামাত থেকে প্রতিবেশী ও বন্ধুদের বাসায় বেড়ানোর পর বাসায় এসে ফোনে বাংলাদেশে বন্ধু বান্ধব ও আতœীয়দের সাথে কথা বলেছি। ঈদের প্রচলিত কিছু  বিষয়  পরিবার ও স্বজনদের জন্য ছিল।  আমি মনে করি ঈদের বার্তাও তাই , পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের উন্নয়ন।  বিলেত ও বাংলাদেশের ঈদ উদযাপনে মিল অমিল  দুটোই  আছে । তবে  দেশীয় কালচার ধীরে ধীরে  বাড়ছে, যেটি অবশ্যই আনন্দদের। আমি  বাংলা প্যারেড ও ওইরাল  বাংলা স্কুলের সাথে যুক্ত। সেখানে  বাংলা ভাষা ও  আবৃত্তি শিখাই। মাতৃভাষা ও  স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের পর  ঈদের জন্য নতুন  কিছু আয়োজন আছে । বিলেতে  বাঙ্গালী সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ খুব ভালো। যদিও কিছু  চ্যালেঞ্জ আছে ,তবে অভিভাবকরা অনেক  সচেতন, যার কারণে বাংলা স্কুল প্রায় অনেক  সিটিতে গড়ে উঠেছে। একারনে আগামী প্রজন্মের সম্ভবনা খুব ভাল।

সংবাদ পাঠক ও সমাজকর্মী  মীর আবদুর রহমান বিলেতের আরেকজন বাংলাদেশী সংস্কৃতি কর্মীর পরিচিত মুখ। তার মতে, এবারের ঈদ ছিলো হাসি ও আনন্দের চমৎকার মিশেলে পরিপূর্ন। খুব বেশি ব্যতিক্রম কিছু না হলেও বিশেষ প্রস্তুতি বলতে ছিলো প্রথমবারের মতো বিলেতের এশিয়ান মুসলিম কমিউনিটির সাথে জমকালো চাঁদ রাত উদযাপন ও পারষ্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়। বিলেত ও বাংলাদেশের ঈদ উদযাপনের ক্ষেত্রে মূল পার্থক্য হলো দু দেশের উদযাপনে, বৈচিত্রে ও আনুষ্ঠানিকতায়। বিলেতে ঈদ কেন্দ্রিক ফ্যাস্টিভ্যালের কথা বলতে গেলে আমার কাছে বিশেষ আনন্দের হল, ঈদের দিনের খুশির বার্তা নিয়ে আমার সংবাদ পরিবেশনা ও কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের ঈদ পার্টিতে আমন্ত্রণ গ্রহন। এছাড়া, লন্ডন মেয়রের আয়োজনে বিলেতের প্রধান ঈদ ফ্যাস্টিভ্যালে অংশগ্রহনের ইচ্ছে তো রয়েছেই। চলমান সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের বিবেচনায় বিলেতে বাঙলা বা বাঙ্গালী সংস্কৃতি ভালোই চলছে। তবে এটি আরো মজবুত ও সুন্দর করতে নতুন প্রজন্মের ব্রিটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটির মাঝে বছরব্যাপী ধারাবাহিকভাবে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও সাহিত্যকে পরিচিত করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।

তৃতীয় বাংলা খ্যাত পূর্ব লন্ডনের ঘরোয়া এক আড্ডায় বিলেতের বাঙ্গালী শিল্পীরা ঈদ উপলক্ষে তাদের মনোভাব তুলে ধরেন। এসময় তারা একে অপরের  ঈদের আয়োজন এবং ধর্মীয় ও সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। বিভিন্ন বিষয়ে নিজেেেদর মধ্যে দ্বিমত থাকলেও একটি বিষয়ে তারা সবাই একমত পোষন করেন। সেটি হচ্ছে -বিলেতে বাঙ্গালী ও বাংলাদেশী সংস্কৃতির পরিধি দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর প্রতিটি পরিবারের বাবা মা নিজেদের সন্তানদের মাঝে বাংলাদেশী কৃষ্টি ও সংস্কৃতির চর্চা আরো বাড়ালে এর পরিমন্ডল আরো বাড়বে, এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।